
খালের পাড়ে সবুজ কৃষি
ঝালকাঠির খননকৃত খালের পাড়ে নতুন মাটিতে
কৃষি বিপ্লব, নতুন স্বপ্নের প্রতিফলন কৃষকদের
আতিকুর রহমান, ঝালকাঠিঃ- সেচ কাজের সুবিধার্থে ঝালকাঠি সদর উপজেলার নবগ্রাম ও বিনয়কাঠি ইউনিয়নের ৩.২৫০ কিলোমিটার খাল ও জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত সেই ধানসিঁড়ি নদীটি খনন করা হয়েছে। এর ফলে নাব্যতা ফিরে আসার পাশাপাশি নদী এবং খালের দু’পাশের মাটিতে কৃষকরা স্বপ্নের প্রতিফলন পাচ্ছেন। শীতকালীন শাক-সবজি চাষে সফল হয়েছেন স্থানীয় চাষীরা। এছাড়াও খাল বা নদীর পানি দিয়ে তাঁদের কৃষি জমিতে সহজেই সেচ কাজ করতে পেরেছেন। ফলে তাদের সেচ খরচ হয়নি বললেই চলে।
জানা গেছে, দেশের ৬৪ জেলার অভ্যন্তরস্থ ছোট নদী, খাল এবং জলাশয় পুনঃখনন (১ম পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় খাল খনন করা হয়। এ প্রকল্পের স্থান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ঝালকাঠি সদর উপজেলার নবগ্রাম ও বিনয়কাঠি ইউনিয়নে ৩ কিলোমিটার ২৫০ মিটার খাল খনন করা হচ্ছে। জীবনানন্দ দাশের কাব্যে উল্লেখিত ধানসিঁড়ি নদী সুগন্ধা নদীর মোহনা থেকে খনন কাজ শুরু হয়। ১০কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ধানসিঁড়ি নদীটির ৮কিলোমিটার প্রায় ২কোটি টাকা ব্যায়ে খনন করা হয়েছে। খননকৃত মাটি দু’পাশে রাখায় ওই সব এলাকার জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। ফলে জমির মালিকরা পরিত্যক্ত জমিতে ফসল বুনিয়ে তারা এখন নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। সরিষা, সূর্যমূখী, শীতকালীন শাক-সবজি ফলিয়ে তারা স্বাবলম্বি হবার প্রত্যাশা করছেন।

ধানসিঁড়ি পাড়ের কৃষক কামাল হোসেন জানান, খালের মতো সরু হওয়া নদীটি খননের ফলে একদিকে নাব্যতা ফিরে এসে প্রবাহমান পানির স্রোতে ফসলী জমির উর্বরতা বেড়েছে। পাশাপাশি দু’পাড়ে খননকৃত মাটি ফেলার ফলে পরিত্যক্ত জমিতে কৃষিজমি হিসেবে উর্বরতা এসেছে। ধানসিঁড়ি তীরের পরিত্যক্ত জমিতে চাষাবাদের আশা ছেড়ে দিয়েছিলো স্থানীয় কৃষকরা। সেই জমিতে এবছর চাষাবাদের ফলে নতুন আশার আলো দেখছেন চাষীরা। কেউ কেউ সরিষা, সূর্যমূখী, শীতকালীন শাক-সবজি চাষাবাদে আশার প্রতিফলন দেখছেন। আবার অনেকে আমন চাষাবাদের ফসলী জমিতে বাঙ্গি-তরমুজ চাষও শুরু করেছেন। নদী খনন আমাদের জন্য আশির্বাদ হয়ে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিনয়কাঠি ইউনিয়েনর স্বল্পসেনাসেনা গ্রামের কৃষক রত্তন আলী হাওলাদার জানান, এই জনগুরুত্বপূর্ণ খালের পানির ওপর এখানকার বোরো ব্লকের প্রায় ২ হাজার একর জমি নির্ভরশীল। এই খাল কাটার পর থেকে খালটি কখনও পুনঃখনন করা হয়নি। ফলে খরস্রোতা খালটি দুইপাশের মাটি জমে মরে যায়। পানির অভাবে অনেক জমির বোরো চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেছিলো। এখন পানি প্রবাহের পাশাপাশি দু’পাড়ের মাটিতে কৃষি কাজ করে প্রতিবছরের চেয়ে এবছর ফলন ভালো পেয়েছি। কাজী শাখাওয়াত হোসেন সেলিম নামে স্থানীয় কৃষক বলেন, খালটির নাব্যতা সংকটের কারণে বোরো চাষের ওপর নির্ভরশীল চাষিদের পরিবারও চরম সংকটের মধ্যে দিন পার করছিলেন। খাল খননে পানির প্রবাহ ঠিক থাকায় চলতি মৌসূমে ক্ষেতগুলোতে ফসলে ভরে গেছে। আগামী মৌসূমেও বছরজুড়ে ফসলে ভরে থাকবে। কৃষকের মুখেও হাসি ফুটবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি। কৃষক সুমন্ত রায় বলেন, দীর্ঘদিন পরে হলেও বর্তমান সরকারের মহতী উদ্যোগে খালটি পুনঃখনন করা হয়েছে। খাল পুনঃখনন করায় এখন এলাকাবাসী মরা খালে পানির যৌবন ফিরে পেয়েছেন। নবগ্রাম ও বিনয়কাঠি ঝালকাঠি জেলার শস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। খাল খননের ফলে দুটি ইউনিয়নের ১০টি গ্রামের ১৫ হাজার কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ঝালকাঠির নবগ্রাম লেগুনা স্ট্যান্ড (ব্রিজ) থেকে বিনয়কাঠি চৌমাথা পূর্বে ১.১৪০ কিলোমিটার, বিনয়কাঠি চৌমাথা থেকে কালিজিরা সংযোগ খালের কড়াপুর পর্যন্ত ২.১১০ কিলোমিটার খনন কাজ চলছে। খালের প্রশস্ততা, নাব্যতা, প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে খননের পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী কাজের বাস্তবায়ন হচ্ছে। মেসার্স ন্যাচারাল নামের এক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি আব্দুল মান্নান এ কাজ বাস্তবায়ন করছেন। এ ব্যাপারে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কেএম নিলয় পাশা বলেন, বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে সেচ কাজের জন্য খালগুলো খনন করেছে। তারই অংশ হিসেবে খাল খননের কাজ ঝালকাঠিতেও করা হয়েছে। খাল খননের ফলে এই এলাকার চাষিদের ধান বা অন্যান্য শাক-সবজি চাষে আর পানির সমস্যা দূরিভূত হয়েছে। খননকৃত খালের মাটিতে এলাকাবাসী কৃষি কাজের অপার সম্ভাবনার সুযোগ পেয়েছেন।
ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম জানান, এজেলার মাটি এমনিতেই অন্যান্য জেলার চেয়ে উর্বর ও কৃষি উৎপাদনে শক্তিশালী। খাল খননের ফলে নতুন মাটি পেয়ে কৃষকরা তাঁদের সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে ফসল ফলাতে সক্ষম হয়েছেন। কৃষি বিভাগ সার্বক্ষণিক কৃষকদের সাথে যোগাযোগ রেখে সার্বিক পরামর্শ প্রদান করেছেন বলেও জানান তিনি।