পলিতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গোয়াইনহাট, জিন্তাপুর, গুঞ্জ কোম্পানি, কানাইঘাট ও জোকিগঞ্জ জেলার কয়েক লাখ মানুষ আটকা পড়েছে। কেউ সাহায্য চাইলেও কোথাও খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই আছেন যাদের গরু নিয়ে সমস্যা হয়। সরকার পাঁচটি বন্যা কবলিত কাউন্টিতে 470টি উচ্ছেদ কেন্দ্র খুলেছে। শুকনো খাবার, চাল ও নগদ টাকা ত্রাণসামগ্রী হিসেবে প্রতিটি অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। বন্যার কারণে উজলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তবে বন্দিদের উদ্ধারে প্রস্তুত সেনাবাহিনী। সিলেটের সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ।
রিমাল ঝড়ের কারণে সিলেটে কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হয়েছে। পৃথকভাবে, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চলে সীমান্ত জুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। ফলে সিলেটের সীমানা ভাটিতে সরে যায়। ফলস্বরূপ, সুরমা, সারি, গোয়েন, দালাই, পায়ান এবং লুয়া সহ সিলের উত্তরের সমস্ত নদীর জল সীমান্তের ওপারে প্রবাহিত হয়েছিল। বুধবার বিকেলে সীমান্তবর্তী জেলা গোয়াইনহাট, জৈন্তাপুর, কানিঘাট ও গঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নদীর পানি প্রবাহিত হতে থাকে। রাতে পানি বাড়তে থাকে। পানিতে আটকা পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। তারা চিৎকার করে সাহায্য চাইলেন। অনেকে সাহায্য চেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেট পোস্ট করেছেন। তবে নৌকা না থাকায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করা যাচ্ছে না। গতকাল সকালে সরকার, বাসিন্দা ও প্রতিনিধিরা উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে ওপার ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চলে কম বৃষ্টিপাতের কারণে কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। জৈন টাপুর জেলার নবনির্বাচিত সভাপতি লিয়াকত আলী পরিষদ সদর, নিজপাট ও চারিকাটা জৈন টাপুর ইউনিয়ন নিয়ে কথা বলেন।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এলাকাটি। এ তিনটি ইউনিয়নের প্রায় সবকটিই ভেঙে পড়েছে। বাড়ির ভেতরে তিন থেকে চার ফুট পানি উঠেছে। অনেক অ্যাডোব বাড়ি ভেঙে পড়েছে। বুধবার সন্ধ্যা থেকে পানিতে আটকে পড়া লোকজন উদ্ধারকারীদের ডাকাডাকি করছে। তবে নৌকা না থাকায় উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা যায়নি। গতকাল ভোর ৪টা থেকে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়। পানিতে আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পশু আশ্রয় কেন্দ্রে শুকনো খাবার তৈরি করা হয়েছিল এবং তাদের বাড়িতে মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল। তবে বিপুল সংখ্যক গবাদিপশুকে বাঁচানো যায়নি। পানিতে ডুবে প্রচুর গবাদিপশু মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধারকৃত গবাদিপশুও খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব ইসলামুর, পশ্চিম ইসলামুর, উত্তর রানীকাই ও ইছাকল ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। তবে পানির নিচে থাকা এলাকার বেশির ভাগ মানুষ আশ্রয় নেয়নি। কেউ কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী মুখপাত্র সুঞ্জিত কুমার চন্দ জানান, সমস্ত ইউপি সিইওকে আটকে পড়া লোকদের আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কানিঘাট উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সুরমা ও লোভা নদীর বাঁধ ভেঙে গ্রামে পানি ঢুকেছে। গতকাল থেকে নদীর পানি কিছুটা কমলেও ওই এলাকায় পানির উচ্চতা তেমন একটা কমেনি। অনেক এলাকা আবার প্লাবিত হবে। এতে উপজেলা ও জেলা সদরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কানিঘাট উপজেলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা নাসরীন জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসন সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।
কুশিয়ারা নদীর পানির উচ্চতা বাড়লে বাঁধ ভেঙে ছাবরিয়া, বাহারশাল, রাড়াই, ভুঁইয়ারমোড়া, মাঝারগ্রাম বা জোকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পানি প্রবাহিত হয়। তাছাড়া পানির উচ্চতা অব্যাহত থাকায় কুশিয়ারা নদীর বিভিন্ন অংশে বাঁধ দিয়ে পানি পড়ছে। উপজেলার প্রায় ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
উপজেলা ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফসানা তাসনিম জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে উপজেলায় একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
সরিয়ে নেওয়া এবং জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র: আঞ্চলিক প্রশাসনের মতে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাইলের পাঁচটি শহরে 470টি উচ্ছেদ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে গোয়াইনহাটে ৫৬টি, জিনতাপুরে ৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র, কানাই ঘাটে ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র, গঞ্জ কর্পোরেশনে ৩৫টি এবং জোকিগঞ্জে ৫৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সাইলের ডেপুটি কমিশনার শেখ রাসেল হাসান বলেন, পাঁচটি জেলায় ত্রাণসামগ্রী হিসেবে মোট এক হাজার ব্যাগ শুকনো পশু, ৭৫ টন চাল এবং আড়াই লাখ টন নগদ অর্থ পাঠানো হয়েছে। উদ্ধারে প্রস্তুত সেনাবাহিনী : বন্যাকবলিত এলাকার মানুষকে উদ্ধারে প্রস্তুত সেনাবাহিনী। সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) মোবারক হুসাইন বলেন, প্রয়োজন হলেই সেনা সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেবে।
সিলেটের সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা: নদীর পানি বৃদ্ধি ও বন্যার কারণে সিলেট অঞ্চলের পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ ঘোষণা করেছে সাধারণ প্রশাসন। নগরীর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে এই পর্যটন কেন্দ্রটি বন্ধের ঘোষণা দেয়। গঞ্জ শহর পর্যটন উন্নয়ন কমিটির সদস্য ও এ অঞ্চলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুঞ্জিত কুমার চন্দ বলেন, এ শহরে দলাই নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলো ধ্বংসের কারণে সব পর্যটক নিখোঁজ হয়েছে। সিলেটে কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।